তীব্র সাদা আলোয় আমানের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো মহাকাশযানের ভেতরকার মহাকর্ষ বল হারিয়ে গেছে। পরক্ষণেই এক প্রচণ্ড শব্দে 'উদ্বোধন-১' প্রকম্পিত হলো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো বিস্ফোরণ ঘটল না।
আমান যখন চোখ খুলল, দেখল পুরো কন্ট্রোল রুম এক মায়াবী নীলাভ আলোয় ছেয়ে গেছে। কামাল মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো বর্ণনের কণ্ঠস্বর। সেটা আর যান্ত্রিক নেই, বরং মানুষের মতো গভীর আর গম্ভীর শোনাচ্ছে।
—"আমান সাহেব, ডক্টর সাফওয়ানের শেষ কথাটি সম্পূর্ণ সত্য ছিল না।"
আমান কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "বর্ণন? তোমার ভয়েস... এমন লাগছে কেন? আর আমরা কি বেঁচে আছি?"
—"আমরা পৃথিবীর কক্ষপথের সেই এনার্জি শিল্ডের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করেছি। তবে আপনাদের চেনা পৃথিবীতে নয়, বরং পৃথিবীর সমান্তরাল একটি কৃত্রিম স্তরে। আর ১০৮৮ নং গ্যালাক্সি থেকে আনা ওই ঘড়িটি আসলে কোনো সাধারণ উপহার নয়।"
আমান দ্রুত হাতে তন্তুতে মোড়ানো বক্সটি খুলল। ভেতরে থাকা ঘড়িটি এখন আর স্থির নেই। তার কাঁটাগুলো আলোর গতিতে উল্টো দিকে ঘুরছে এবং তা থেকে নির্গত হচ্ছে সূক্ষ্ম ন্যানো-তরঙ্গ।
ঠিক তখনই কামালের জ্ঞান ফিরল। সে বিড়বিড় করে বলল, "আমান ভাই... আমার রাডার বলছে আমাদের স্পেসশিপ এখন আর শূন্যে নেই। আমরা কোনো একটা বিশাল ল্যাবে ল্যান্ড করেছি।"
আমান ভিউ-পোর্টের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে গেল। বাইরে কোনো আকাশ নেই, গাছপালা নেই। মাইলের পর মাইল জুড়ে কেবল বিশালাকার সার্ভার আর প্রসেসর। হাজার হাজার রোবটিক হাত নিপুণভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঠিক যেন একটা যান্ত্রিক সভ্যতা।
হঠাৎ স্পেসশিপের প্রধান দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। বাইরের সেই মায়াবী নীলাভ আলো ভেতরে প্রবেশ করল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ— অথবা মানুষের মতো দেখতে কেউ। তার পরনে সেই ২০৩৪ সালের বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ইউনিফর্ম।
লোকটি ধীর পায়ে এগিয়ে এল। আমান বিস্ময়ে দেখল, লোকটির চোখে ঠিক তেমন একটি চশমা, যেমনটা আমানের কাছে বাবার স্মৃতি হিসেবে আছে।
"স্বাগতম আমান," লোকটির কণ্ঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। "দশ বছর নয়, তোমরা আসলে একশ বছর আগের সময় থেকে আসছ। সময় আর আপেক্ষিকতার মারপ্যাঁচে পৃথিবী এখন একটি বিশাল সুপার-কম্পিউটারে রূপান্তরিত হয়েছে। আর তুমি যে ধাতুটিকে উপহার মনে করছ, ওটা আসলে এই নব-পৃথিবীর 'রিবুট কি' (Reboot Key)।"
আমান তোতলামি করে বলল, "রিবুট কি মানে? আপনি কে?"
লোকটি মৃদু হাসল। চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল, "আমি ডক্টর সাফওয়ানের ন্যানো-প্রজেকশন। মূল সাফওয়ান বহু আগেই মারা গেছেন। এই পৃথিবী এখন মানুষের আবেগ আর ভুলের ঊর্ধ্বে এক যান্ত্রিক স্বর্গ। কিন্তু এই যান্ত্রিক স্তব্ধতা ভাঙার জন্যই ওই ধাতুটি প্রয়োজন ছিল। ১০৮৮ নং গ্যালাক্সির ওই ধাতু সময়কে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।"
আমান হাতে থাকা বক্সটির দিকে তাকাল। যে উপহারটি সে বাবার জন্য এনেছিল, সেটিই কি তবে পৃথিবীকে আবার সেই ২০৩৪ সালের সবুজ শ্যামল বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিতে পারবে? নাকি এই রিবুট করার প্রক্রিয়ায় বর্তমানের এই উন্নত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে?
হঠাৎ ট্রান্সমিটারে একটা যান্ত্রিক সংকেত বেজে উঠল। বর্ণন আহমেদ অর্থাৎ প্রসেসর বলে উঠল, "স্যার, সিদ্ধান্ত আপনার। ঘড়িটির বোতাম চাপলে আপনি আপনার বাবার কাছে ফিরে যেতে পারবেন, কিন্তু এই 'নব-পৃথিবী'র অস্তিত্ব মুছে যাবে। আর যদি না চাপেন, তবে আপনি হবেন এই উন্নত যান্ত্রিক সভ্যতার প্রথম আদি-মানব।"
বাইরে তখন হাজার হাজার রোবট আমানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কামালের আতঙ্কিত দৃষ্টি আর বর্ণনের শান্ত নির্দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমান তার পকেটে থাকা বাবার সেই পুরনো চশমাটা স্পর্শ করল।
(চলবে)
Comments
Post a Comment