Skip to main content

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা,পর্ব ২

 ট্রান্সমিটারের লাল বাতিটা আমানের বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কার কাঁপন ধরিয়ে দিল। সংকেতটা এতই সংক্ষিপ্ত যে তার পাঠোদ্ধার করতে বর্ণনেরও কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

​আমান অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল, "বর্ণন, কী লেখা? ডিকোড করো দ্রুত!"

​পর্দার আলো কয়েকবার দপদপ করে জ্বলে উঠল। বর্ণনের যান্ত্রিক স্বরে এবার এক অদ্ভুত জড়তা। সে ধীরস্থিরভাবে বলল, "স্যার, বার্তাটি বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে। এতে লেখা আছে: 'প্রবেশাধিকার স্থগিত। নব-পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশের চেষ্টা করবেন না। বিপদ আসন্ন।'"

​আমান স্তম্ভিত হয়ে গেল। "প্রবেশাধিকার স্থগিত মানে? আমি দশ বছর পর নিজের দেশে ফিরছি, আর ওরা বলছে প্রবেশ নিষেধ? কামাল! এই কামাল, এদিকে শোনো!"

​পাশের ঘর থেকে কামালের ঠুকঠাক শব্দ থেমে গেল। সে দ্রুত পায়ে আমানের রুমে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটি ছোট ন্যানো-স্ক্রুড্রাইভার। কামালের চোখেমুখে বিস্ময়, "কী হয়েছে আমান ভাই? অ্যালার্ম বাজছে কেন?"

​আমান সংকেতটা দেখাতেই কামালের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল, "বিপদ আসন্ন? কিসের বিপদ? আমাদের ন্যানোট্যাক রাডারে তো অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ছে না।"

​আমান ট্রান্সমিটারটা হাতে নিয়ে ডাইরেক্ট অডিও লিঙ্কের চেষ্টা করল। কয়েকবার স্ট্যাটিক নয়েজের পর ওপার থেকে এক ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এল, "নভোযান 'উদ্বোধন-১', আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন? আমি ডক্টর সাফওয়ান বলছি। আপনাদের সময়জ্ঞান এবং আমাদের সময়জ্ঞানে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ওই কৃষ্ণ গহ্বরের প্রভাবে আপনারা যে দশ বছর কাটিয়েছেন, পৃথিবীতে তার চেয়েও অনেক বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।"

​কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে স্পেসশিপটা কেঁপে উঠল। আমান ছিটকে গিয়ে টেবিলের কোণাটা ধরল। তার বাবার দেওয়া সেই পুরনো চশমাটা মেঝেতে পড়ে গেল।

​"বর্ণন! কী হচ্ছে? আমাদের ওপর কি কেউ আক্রমণ করেছে?" আমান চিৎকার করে উঠল।

​বর্ণনের পর্দার গ্রাফগুলো লাল হয়ে গেছে। সে বলল, "না স্যার, কোনো যান্ত্রিক আক্রমণ নয়। পৃথিবীর কক্ষপথে এক বিশাল এনার্জি শিল্ড তৈরি করা হয়েছে। আমাদের স্পেসশিপ সেই অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে। আর স্যার... একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে ভুলে গিয়েছি।"

​"কী তথ্য?"

​"২০৩৪ সালে যে বাংলাদেশ আপনারা ফেলে এসেছিলেন, বর্তমানের ভূ-মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। গ্লোবাল ডাটাবেজ বলছে, ২০৫৬ সালের মহাপ্রলয়ের পর পৃথিবীর মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই 'নব-পৃথিবী' এখন একটি একক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত। তারা আপনাদের শনাক্ত করতে পারছে না।"

​আমানের হাতের বক্সটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। বাবার জন্য আনা সেই ঘড়িটা ভেতরে আছে। দশ বছর পর উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এখন পৃথিবীটাই যেন এক অচেনা গ্রহ।

​কামাল চেঁচিয়ে উঠল, "আমান ভাই! দেখুন! নিচে ওটা কী?"

​স্পেসশিপের ভিউ-পোর্ট দিয়ে আমান তাকাল। নীলচে পৃথিবীর বুকে এখন বিশাল বিশাল ধাতব বলয়। যেন গ্রহটাকে কেউ শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। হঠাৎ ট্রান্সমিটারে ডক্টর সাফওয়ানের সেই কণ্ঠ আবার ফিরে এল, তবে এবার সেটা অনেক বেশি আর্তনাদপূর্ণ।

​"আমান, যদি বেঁচে থাকতে চাও, তবে ফিরে যাও! ১০৮৮ নং গ্যালাক্সির সেই ধাতুটি পৃথিবীতে আনবে না! ওটাই সর্বনাশের মূল কারণ! ওটা কোনো ধাতু নয়, ওটা একটা—"

​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা তীব্র আলোকরশ্মি পৃথিবীর বুক থেকে ধেয়ে এল স্পেসশিপের দিকে। আমানের সামনে সবকিছু সাদা হয়ে যেতে শুরু করল। কেবল তার কানে বাজতে লাগল বাবার সেই পুরনো চশমাটার মেঝেতে পড়ে যাওয়ার শব্দ।

​(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

খোঁজ নেই

শূণ্যতা এসে ঘিরে চারিধারে মন ছুটে যেদিকেই; হৃদয়ের মাঝে যে কাব্য ছিল তার কোনো খোঁজ নেই। বারে বারে খুঁজি, তার সব স্মৃতি  তবু দেখি নেই সে, বিস্মৃতি বলে সব রীতি ভুল,  মিলবে না তার দিশে। কবিতার লেখা পথ ভুলে যায় মন হলে বিচলিত, নিখোঁজ এমনি তার সব তান, সেই কেন অবারিত। শূন্যতা আনে বিরহের সুর মনে তাই বারবার  অপার বিষাদে আনে ক্রন্দন  হৃদয়েের চারিধার। ✍️:নাহিয়ান 

পথিকৃৎ

 পথিকৃৎ  চলিছে পথিক,তিমির রাত্রি, একেলা নিঝুম পথে চক্ষু তাহার ভ্রমিতেছে হায়, মুসাফির মুসিবতে ।। পথের প্রান্তরে শেয়ালের ডাক, নিশিথে দানিল ভয়, ভয়ার্ত পথিক চলিছে কাঁপিয়া তবু,মানে নাই পরাজয়।। পান্থ দেখিল পথেরি পাশে আঁকা-বাঁকা মোড় কত, দিশাহীন পথে ছুটিবে কোথায়? বাঁধা যেথা অবিরত ।। দূরপথ রেখা,পাইল না দেখা; নাই কেন কোন আলো, ঘনিয়াছে যেন আমাবস্যার রাত, চারদিকে ঘোর কালো।। মেঠোপথ পাশে বায়ে শত মোড়, ডানে দেখে সোজা হেথা, বিষাদগ্রস্থ পথিকের বুকে তাই বিধিঁল ভয়ের ব্যাথা।। সহসা তন্দ্রা লাগিল নেত্রে,  শক্তি   পাইল   বুকে; "হস্তে প্রদীপ,আলোকিত তায় " হেরিল সে একোন লোকে? এবার ঘুম ছুটিয়া পালাইল, চক্ষু  উঠিল  জাগি, দিগন্তে কোন প্রদীপ চিহ্ন দিশা দিল তার লাগি? অদূরে পথিকৃতের প্রদীপ দিশা দেয় যেই আলো, সে আলোয় পথিক খুজে পেল পথ পেল সত্যের সব ভালো।।  নকশা মেলিয়া, খানিক দুলিয়া  হেরিল সেঁ পথিক পানে, চাঁদহীন রাতে তারকারা সব জ্বলে ওঠে আসমানে।। পথিকৃৎ যেন বলিল তাহাকে এসো এসো এই দিকে- সত্যের পথ,সাম্যের পথ- শান্তিচিহ্ন লিখে।। পথিকৃতের পদধ্বনি শুনি, পথিক ছুটিয়া চলে চির- ...

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা

  ১ আবছা নীলাভ বিন্দুটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা।  তর সইছে না তার। স্প্রেরস্যুটটায় আবার চোখ বুলাল আমান। -নাহ,এবার ঠিকই আছে।  এতক্ষণে ক্লান্ত চোখ চারপাশে ঘুরতেই স্থির হলো তা টেবিলে রাখা একটি চশমাতে।আমান আনমনা হয়ে যায়। চশমাটা তুলে হাতে নেয় সে।পুরনো একটি চশমা, বছর দশেক আগের হবে হয়তো।আরো বেশিও হতে পারে, অবশ্য আর  পরার মতো অবস্থা নেই,নড়েবড়ে। বাবার স্মৃতি হিসেবে রাখা।পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যে  বাবা এনেছিল এই উপহার।  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আমান,বাবাকে দেখা হচ্ছে না দশ বছর ধরে। তখন ছিল ২০৩৪ সাল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তাব দেয় 'বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা' গঠনের।অর্থনীতিতে বাংলাদেশ মোটামুটি উন্নত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে,এমন প্রেক্ষাপটে তাদের এ প্রস্তাব অবশ্য যৌক্তিক। জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় সরকারও মনোযোগী হয়। শেষপর্যন্ত গঠন হয় বাংলাদেশের নামে প্রথম মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এই সংস্থার যুগান্তকারী পদক্ষেপ -উন্নত দেশসমূহের সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ। শুক্র ও মঙ্গল গ্রহে জীবনের সন্ধানে কয়েকজন নভোচারী পাঠানো হবে।বাংলাদেশেও কতেক ...

মেঘজাল

আকাশের নীলে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে আকাশের পথে জলকণা আনে মেঘজাল কিছু ঘেমে। শীতল সমীর বহিছে কেমনি,আভাসেই বারিধারা, প্রকৃতির এত অবারিত দান মন ভুলে পেল কারা? ধূসরিত মাঠ ছাপিয়ে জেগেছে সবুজাভ কিছু লেখা, আপন হৃদয়ে কিছু কথা ছিল,পিছু পিছু তাই দেখা। নিশাস যেমনি হৃদপটে আনে হারানোর কিছু সুর, তেমন দৃশ্য প্রকৃতিও আঁকে,সে তো কভু নয় দূর। নিসর্গে কেন জাগছে দৃশ্য আপন খেয়াল রূপে, সুরভি ছড়ালো চারদিকে ছেয়ে বেখেয়ালি মন ধূপে। নীলাভ আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে, হৃদয় আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই,মন্দ্রা কেমন প্রেমে; Photo:Gemini

অনিশ্চিতি

  মাগরিবেরই পড়ছে আযান,সূর্য ডুবে গেছে, নিসর্গ তাই নিরব সভায় দিচ্ছে ধ্বনি যেচে। সবুজঘেরা অরণ্যতে সভার কার্য শেষ, প্রকৃতির প্রাণের সখাও দান পেয়েছে বেশ। গাছ গাছালি,বৃক্ষ লতা, চলছে যেন ধীরে, বিকেল শেষে সন্ধ্যা হলো,ফিরবে তারা নীড়ে। আবছা আলোয় ফিরল যবে ক্লান্তি জাগে দেহে, নিত্যচেনা নিকুঞ্জ ওই,নিজের আপন গেহে। গাছের ঝাড়ও ঘুমের ঘোরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়, ঝিঁঝিপোকা চলছে হেকে,সেতো থামার নয়। আঁধার বনের আবছা ছায়া, বৃক্ষরাও তো ঘুম, প্রান্তসীমায় খানিক হাওয়া দেয় বুলিয়ে চুম। গাছের পাতা উঠলো দুলে,কমলো ঘুমের রেশ, ঊর্ধ্বপানে তারার মেলায় বাড়ায় তার আবেশ। অচিনপুরের অচিন তারা,আবাস তাদের কোথা? আলোক বিলায় ধরার মাঝে,জাগায় আলোর সভা। দূরের পথে চলন তবু আঁধার তার সঙ্গে, বনের ছায়ায় যায় মিলিয়ে শুধুই তরঙ্গে। গাছগুলি কি দ্যায় পাহারা,শুধু রয় দাঁড়ায়? অসাড় তারই ডালগুলো ঠায় হাওয়াতে নাড়ায়। এতেক ভেবে ঘুম অচেতন বৃক্ষ ওঠে জেগে, গুল্ম,তাতে উঠলো নাচন,খানিক বাতাস লেগে। তরুলতার ক্লান্তি মিলায়,সজীব হলো প্রাণ; নতুন দিনের আগাম কথা,জাগলো নূতন গান। নিশিথেরই সময় রেখা গড়ায় তবে শেষে, মানব নামের যন্ত্রে দ্যাখো অনিশ্চিতি মেশে। ৪...