ট্রান্সমিটারের লাল বাতিটা আমানের বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কার কাঁপন ধরিয়ে দিল। সংকেতটা এতই সংক্ষিপ্ত যে তার পাঠোদ্ধার করতে বর্ণনেরও কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
আমান অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল, "বর্ণন, কী লেখা? ডিকোড করো দ্রুত!"
পর্দার আলো কয়েকবার দপদপ করে জ্বলে উঠল। বর্ণনের যান্ত্রিক স্বরে এবার এক অদ্ভুত জড়তা। সে ধীরস্থিরভাবে বলল, "স্যার, বার্তাটি বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে। এতে লেখা আছে: 'প্রবেশাধিকার স্থগিত। নব-পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশের চেষ্টা করবেন না। বিপদ আসন্ন।'"
আমান স্তম্ভিত হয়ে গেল। "প্রবেশাধিকার স্থগিত মানে? আমি দশ বছর পর নিজের দেশে ফিরছি, আর ওরা বলছে প্রবেশ নিষেধ? কামাল! এই কামাল, এদিকে শোনো!"
পাশের ঘর থেকে কামালের ঠুকঠাক শব্দ থেমে গেল। সে দ্রুত পায়ে আমানের রুমে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটি ছোট ন্যানো-স্ক্রুড্রাইভার। কামালের চোখেমুখে বিস্ময়, "কী হয়েছে আমান ভাই? অ্যালার্ম বাজছে কেন?"
আমান সংকেতটা দেখাতেই কামালের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল, "বিপদ আসন্ন? কিসের বিপদ? আমাদের ন্যানোট্যাক রাডারে তো অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ছে না।"
আমান ট্রান্সমিটারটা হাতে নিয়ে ডাইরেক্ট অডিও লিঙ্কের চেষ্টা করল। কয়েকবার স্ট্যাটিক নয়েজের পর ওপার থেকে এক ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এল, "নভোযান 'উদ্বোধন-১', আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন? আমি ডক্টর সাফওয়ান বলছি। আপনাদের সময়জ্ঞান এবং আমাদের সময়জ্ঞানে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ওই কৃষ্ণ গহ্বরের প্রভাবে আপনারা যে দশ বছর কাটিয়েছেন, পৃথিবীতে তার চেয়েও অনেক বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।"
কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে স্পেসশিপটা কেঁপে উঠল। আমান ছিটকে গিয়ে টেবিলের কোণাটা ধরল। তার বাবার দেওয়া সেই পুরনো চশমাটা মেঝেতে পড়ে গেল।
"বর্ণন! কী হচ্ছে? আমাদের ওপর কি কেউ আক্রমণ করেছে?" আমান চিৎকার করে উঠল।
বর্ণনের পর্দার গ্রাফগুলো লাল হয়ে গেছে। সে বলল, "না স্যার, কোনো যান্ত্রিক আক্রমণ নয়। পৃথিবীর কক্ষপথে এক বিশাল এনার্জি শিল্ড তৈরি করা হয়েছে। আমাদের স্পেসশিপ সেই অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে। আর স্যার... একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে ভুলে গিয়েছি।"
"কী তথ্য?"
"২০৩৪ সালে যে বাংলাদেশ আপনারা ফেলে এসেছিলেন, বর্তমানের ভূ-মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। গ্লোবাল ডাটাবেজ বলছে, ২০৫৬ সালের মহাপ্রলয়ের পর পৃথিবীর মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই 'নব-পৃথিবী' এখন একটি একক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত। তারা আপনাদের শনাক্ত করতে পারছে না।"
আমানের হাতের বক্সটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। বাবার জন্য আনা সেই ঘড়িটা ভেতরে আছে। দশ বছর পর উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এখন পৃথিবীটাই যেন এক অচেনা গ্রহ।
কামাল চেঁচিয়ে উঠল, "আমান ভাই! দেখুন! নিচে ওটা কী?"
স্পেসশিপের ভিউ-পোর্ট দিয়ে আমান তাকাল। নীলচে পৃথিবীর বুকে এখন বিশাল বিশাল ধাতব বলয়। যেন গ্রহটাকে কেউ শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। হঠাৎ ট্রান্সমিটারে ডক্টর সাফওয়ানের সেই কণ্ঠ আবার ফিরে এল, তবে এবার সেটা অনেক বেশি আর্তনাদপূর্ণ।
"আমান, যদি বেঁচে থাকতে চাও, তবে ফিরে যাও! ১০৮৮ নং গ্যালাক্সির সেই ধাতুটি পৃথিবীতে আনবে না! ওটাই সর্বনাশের মূল কারণ! ওটা কোনো ধাতু নয়, ওটা একটা—"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা তীব্র আলোকরশ্মি পৃথিবীর বুক থেকে ধেয়ে এল স্পেসশিপের দিকে। আমানের সামনে সবকিছু সাদা হয়ে যেতে শুরু করল। কেবল তার কানে বাজতে লাগল বাবার সেই পুরনো চশমাটার মেঝেতে পড়ে যাওয়ার শব্দ।
(চলবে)
Comments
Post a Comment