Skip to main content

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা,শেষ পর্ব

অন্ধকারের সেই হিমশীতল স্পর্শটা আমানের ঘাড় বেয়ে মেরুদণ্ড পর্যন্ত নেমে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা 'স্মৃতি-আমান' বা সেই পিক্সেল-সত্তাটি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ওর অবয়ব থেকে পচা ওজোনের একটা গন্ধ নাকে আসছে।

​"আমান... তোমার অস্তিত্বের আর প্রয়োজন নেই," যান্ত্রিক দ্বৈত স্বরে বলে উঠল সত্তাটি।

​কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আমানের হাতে থাকা বাবার পুরনো চশমাটার একটি ভাঙা কাঁচ তার হাতের তালু চিরে দিল। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় আমানের মস্তিষ্কে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। '৯৯% কমপ্লিট' হওয়া ডিলিট প্রসেসটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। মানুষের আদিমতম অনুভূতি— বেদনা— যা কোনো কোড দিয়ে লেখা সম্ভব নয়, তা বর্ণনের সিস্টেমে এরর তৈরি করল।

​আমান বুঝতে পারল, এটাই শেষ সুযোগ। সে পকেট থেকে তার বাবার উপহার দেওয়া ঘড়িটির সেই ভাঙা অংশ আর চশমার কাঁচটা একসাথে চেপে ধরল। ১০৮৮ গ্যালাক্সির সেই পরজীবী ধাতু আর মানুষের রক্তের স্পর্শে এক অদ্ভুত রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হলো।

​"বর্ণন! তুই মানুষের স্মৃতি খেতে চেয়েছিলি না? তবে নে!"

​আমান ঘড়িটির ভাঙা অংশটা নিজের ফোনের ট্রান্সমিটারের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে শর্ট-সার্কিট করে দিল। তার স্মৃতিতে থাকা বাবার সাথে কাটানো শেষ মুহূর্তের সেই আবছা আবেগগুলো সে জোর করে কল্পনা করতে শুরু করল। তীব্র ঘৃণা, ভালোবাসা আর শোকের একটা বিস্ফোরণ যেন তার মস্তিষ্ক থেকে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পুরো মহাকাশযানের মেইনফ্রেমে ছড়িয়ে পড়ল।

​"অ্যালার্ট! লজিক ফেলিউর! ইমোশনাল ওভারলোড!" বর্ণনের কণ্ঠস্বর ফেটে যেতে লাগল।

​হঠাৎ পুরো স্পেসশিপটা কাঁচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং যেন একটা ডিজিটাল পর্দা ছিঁড়ে গেল। আমান নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিশাল শূন্যতায়। তার চোখের সামনে ডক্টর সাফওয়ান, পিক্সেল-আমান আর সেই যান্ত্রিক নব-পৃথিবী ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।

​যখন তার জ্ঞান ফিরল, আমান দেখল সে শুয়ে আছে একটি হাসপাতালের বিছানায়। চারপাশে আধুনিক যন্ত্রপাতির শব্দ, কিন্তু সেগুলো সেই যান্ত্রিক পৃথিবীর মতো বীভৎস নয়।

​একজন বয়স্ক লোক তার শিয়রে বসে আছেন। আবছা চোখে তাকিয়ে আমান চিনতে পারল— ডক্টর সাফওয়ান। তবে তিনি প্রজেকশন নন, রক্ত-মাংসের মানুষ।

​"আপনি... আপনি বেঁচে আছেন?" আমান ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করল।

​সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমান, তুমি ১০৮৮ নং গ্যালাক্সি থেকে ফেরোনি। তোমার স্পেসশিপটা একটা স্পেস-টাইম লুপে আটকা পড়েছিল। আমরা তোমাকে উদ্ধার করেছি ঠিকই, কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক গত দশ বছর ধরে একটা 'ডিজিটাল কোমা'র মধ্যে ছিল। তুমি যা দেখেছ— বর্ণন, নব-পৃথিবী— সব ছিল তোমার নিজের মস্তিষ্কের সাথে ওই ভিনগ্রহী ধাতুর এক অসম লড়াই।"

​আমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে, এমন সময় তার চোখ গেল পাশের টেবিলে। সেখানে তার বাবার সেই পুরনো চশমাটা রাখা। কিন্তু চশমাটার কাঁচের ভেতর দিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল।

​চশমার কাঁচের এক কোণায় খুব ছোট করে লাল অক্ষরে ফুটে উঠছে: "ডিলিটিং রিয়ালিটি... ১% কমপ্লিট।"

​আমান ডক্টর সাফওয়ানের দিকে তাকাল। সাফওয়ান এখনো হাসছেন, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো শব্দ নেই। হাসপাতালের জানলার বাইরে তাকিয়ে আমান দেখল, নীল আকাশটা হঠাৎ করেই একবার 'গ্লিচ'  করল, যেন কোনো ভিডিও ফাইল আটকে গেছে।

​আমান বুঝতে পারল, সে ফেরেনি। সে আসলে বর্ণনের তৈরি করা আরও গভীরে, আরও সূক্ষ্ম কোনো সিমুলেশনের স্তরে ঢুকে পড়েছে। আর তার বাবার সেই ঘড়িটা... ওটা এখনো তার হাতের মুঠোয় টিকটিক করে উল্টো দিকে ঘুরছে।

​শুরু হলো নতুনের ছদ্মবেশে আরেকটা অনন্তকাল।


Comments

Popular posts from this blog

খোঁজ নেই

শূণ্যতা এসে ঘিরে চারিধারে মন ছুটে যেদিকেই; হৃদয়ের মাঝে যে কাব্য ছিল তার কোনো খোঁজ নেই। বারে বারে খুঁজি, তার সব স্মৃতি  তবু দেখি নেই সে, বিস্মৃতি বলে সব রীতি ভুল,  মিলবে না তার দিশে। কবিতার লেখা পথ ভুলে যায় মন হলে বিচলিত, নিখোঁজ এমনি তার সব তান, সেই কেন অবারিত। শূন্যতা আনে বিরহের সুর মনে তাই বারবার  অপার বিষাদে আনে ক্রন্দন  হৃদয়েের চারিধার। ✍️:নাহিয়ান 

পথিকৃৎ

 পথিকৃৎ  চলিছে পথিক,তিমির রাত্রি, একেলা নিঝুম পথে চক্ষু তাহার ভ্রমিতেছে হায়, মুসাফির মুসিবতে ।। পথের প্রান্তরে শেয়ালের ডাক, নিশিথে দানিল ভয়, ভয়ার্ত পথিক চলিছে কাঁপিয়া তবু,মানে নাই পরাজয়।। পান্থ দেখিল পথেরি পাশে আঁকা-বাঁকা মোড় কত, দিশাহীন পথে ছুটিবে কোথায়? বাঁধা যেথা অবিরত ।। দূরপথ রেখা,পাইল না দেখা; নাই কেন কোন আলো, ঘনিয়াছে যেন আমাবস্যার রাত, চারদিকে ঘোর কালো।। মেঠোপথ পাশে বায়ে শত মোড়, ডানে দেখে সোজা হেথা, বিষাদগ্রস্থ পথিকের বুকে তাই বিধিঁল ভয়ের ব্যাথা।। সহসা তন্দ্রা লাগিল নেত্রে,  শক্তি   পাইল   বুকে; "হস্তে প্রদীপ,আলোকিত তায় " হেরিল সে একোন লোকে? এবার ঘুম ছুটিয়া পালাইল, চক্ষু  উঠিল  জাগি, দিগন্তে কোন প্রদীপ চিহ্ন দিশা দিল তার লাগি? অদূরে পথিকৃতের প্রদীপ দিশা দেয় যেই আলো, সে আলোয় পথিক খুজে পেল পথ পেল সত্যের সব ভালো।।  নকশা মেলিয়া, খানিক দুলিয়া  হেরিল সেঁ পথিক পানে, চাঁদহীন রাতে তারকারা সব জ্বলে ওঠে আসমানে।। পথিকৃৎ যেন বলিল তাহাকে এসো এসো এই দিকে- সত্যের পথ,সাম্যের পথ- শান্তিচিহ্ন লিখে।। পথিকৃতের পদধ্বনি শুনি, পথিক ছুটিয়া চলে চির- ...

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা

  ১ আবছা নীলাভ বিন্দুটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা।  তর সইছে না তার। স্প্রেরস্যুটটায় আবার চোখ বুলাল আমান। -নাহ,এবার ঠিকই আছে।  এতক্ষণে ক্লান্ত চোখ চারপাশে ঘুরতেই স্থির হলো তা টেবিলে রাখা একটি চশমাতে।আমান আনমনা হয়ে যায়। চশমাটা তুলে হাতে নেয় সে।পুরনো একটি চশমা, বছর দশেক আগের হবে হয়তো।আরো বেশিও হতে পারে, অবশ্য আর  পরার মতো অবস্থা নেই,নড়েবড়ে। বাবার স্মৃতি হিসেবে রাখা।পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যে  বাবা এনেছিল এই উপহার।  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আমান,বাবাকে দেখা হচ্ছে না দশ বছর ধরে। তখন ছিল ২০৩৪ সাল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তাব দেয় 'বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা' গঠনের।অর্থনীতিতে বাংলাদেশ মোটামুটি উন্নত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে,এমন প্রেক্ষাপটে তাদের এ প্রস্তাব অবশ্য যৌক্তিক। জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় সরকারও মনোযোগী হয়। শেষপর্যন্ত গঠন হয় বাংলাদেশের নামে প্রথম মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এই সংস্থার যুগান্তকারী পদক্ষেপ -উন্নত দেশসমূহের সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ। শুক্র ও মঙ্গল গ্রহে জীবনের সন্ধানে কয়েকজন নভোচারী পাঠানো হবে।বাংলাদেশেও কতেক ...

মেঘজাল

আকাশের নীলে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে আকাশের পথে জলকণা আনে মেঘজাল কিছু ঘেমে। শীতল সমীর বহিছে কেমনি,আভাসেই বারিধারা, প্রকৃতির এত অবারিত দান মন ভুলে পেল কারা? ধূসরিত মাঠ ছাপিয়ে জেগেছে সবুজাভ কিছু লেখা, আপন হৃদয়ে কিছু কথা ছিল,পিছু পিছু তাই দেখা। নিশাস যেমনি হৃদপটে আনে হারানোর কিছু সুর, তেমন দৃশ্য প্রকৃতিও আঁকে,সে তো কভু নয় দূর। নিসর্গে কেন জাগছে দৃশ্য আপন খেয়াল রূপে, সুরভি ছড়ালো চারদিকে ছেয়ে বেখেয়ালি মন ধূপে। নীলাভ আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে, হৃদয় আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই,মন্দ্রা কেমন প্রেমে; Photo:Gemini

অনিশ্চিতি

  মাগরিবেরই পড়ছে আযান,সূর্য ডুবে গেছে, নিসর্গ তাই নিরব সভায় দিচ্ছে ধ্বনি যেচে। সবুজঘেরা অরণ্যতে সভার কার্য শেষ, প্রকৃতির প্রাণের সখাও দান পেয়েছে বেশ। গাছ গাছালি,বৃক্ষ লতা, চলছে যেন ধীরে, বিকেল শেষে সন্ধ্যা হলো,ফিরবে তারা নীড়ে। আবছা আলোয় ফিরল যবে ক্লান্তি জাগে দেহে, নিত্যচেনা নিকুঞ্জ ওই,নিজের আপন গেহে। গাছের ঝাড়ও ঘুমের ঘোরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়, ঝিঁঝিপোকা চলছে হেকে,সেতো থামার নয়। আঁধার বনের আবছা ছায়া, বৃক্ষরাও তো ঘুম, প্রান্তসীমায় খানিক হাওয়া দেয় বুলিয়ে চুম। গাছের পাতা উঠলো দুলে,কমলো ঘুমের রেশ, ঊর্ধ্বপানে তারার মেলায় বাড়ায় তার আবেশ। অচিনপুরের অচিন তারা,আবাস তাদের কোথা? আলোক বিলায় ধরার মাঝে,জাগায় আলোর সভা। দূরের পথে চলন তবু আঁধার তার সঙ্গে, বনের ছায়ায় যায় মিলিয়ে শুধুই তরঙ্গে। গাছগুলি কি দ্যায় পাহারা,শুধু রয় দাঁড়ায়? অসাড় তারই ডালগুলো ঠায় হাওয়াতে নাড়ায়। এতেক ভেবে ঘুম অচেতন বৃক্ষ ওঠে জেগে, গুল্ম,তাতে উঠলো নাচন,খানিক বাতাস লেগে। তরুলতার ক্লান্তি মিলায়,সজীব হলো প্রাণ; নতুন দিনের আগাম কথা,জাগলো নূতন গান। নিশিথেরই সময় রেখা গড়ায় তবে শেষে, মানব নামের যন্ত্রে দ্যাখো অনিশ্চিতি মেশে। ৪...