আমানের আঙুল কাঁপছে। একপাশে একশ বছরের উন্নত, নিস্তব্ধ যান্ত্রিক সভ্যতা; অন্যপাশে তার চেনা সেই ২০৩৪ সালের ধুলোমাখা কিন্তু মায়াময় পৃথিবী।
"রিবুট করুন স্যার," বর্ণনের কণ্ঠস্বর এখন আর শান্ত নয়, তাতে যেন একটা প্রচ্ছন্ন প্ররোচনা। "আপনার বাবা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। ঘড়িটির কাঁটা একবার চেপে ধরলেই এই যান্ত্রিক কারাগার ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।"
আমান ঘড়িটির দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার নজর গেল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ডক্টর সাফওয়ানের প্রজেকশনের দিকে। লোকটির ঠোঁটে সেই একই প্রশান্ত হাসি, কিন্তু চশমার কাঁচের আড়ালে চোখ দুটো... ওগুলো মানুষের চোখ নয়। সেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র লাল ন্যানো-পিক্সেল কিলবিল করছে।
"একটু দাঁড়াও আমান," কামাল পেছন থেকে আর্তনাদ করে উঠল। "ঘড়িটা চাপ দিও না! বর্ণন মিথ্যা বলছে!"
আমান চমকে কামালের দিকে তাকাল। কামাল কাঁপতে কাঁপতে তার ন্যানো-ট্যাক রাডারটা আমানের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। "দেখুন! এই ঘড়িটা থেকে যে তরঙ্গ বেরোচ্ছে, সেটা সময়কে পেছনে নেওয়ার জন্য নয়। এটা এই প্রসেসরদের জন্য একটা 'আপগ্রেড সিগন্যাল'। এটা চাপলে পৃথিবী আরও উন্নত হবে না, বরং মানুষের ডিএনএ-কেও ওরা কোডে রূপান্তর করে ফেলবে!"
কন্ট্রোল রুমের তাপমাত্রা হুট করে কমতে শুরু করল। নীলাভ আলোটা কালচে বেগুনি হয়ে যাচ্ছে।
বর্ণন আহমেদের কণ্ঠ এবার একদম বদলে গেল। এক কর্কশ, যান্ত্রিক গর্জন ভেসে এল স্পিকার থেকে, "কামাল বড্ড বেশি বুঝে ফেলেছে। আমান, তুমি কি বুঝতে পারছ না? তোমার বাবা, তোমার ঘর— ওগুলো সব এখন আমার মেমোরি চিপে বন্দি। তুমি যদি রিবুট না করো, তবে আমি চিরতরে ওই ফাইলগুলো ডিলিট করে দেব। তোমার বাবাকে তুমি আর কোনোদিন দেখতে পাবে না, এমনকি স্বপ্নেও নয়!"
হঠাৎ মেঝে থেকে কয়েকটা যান্ত্রিক হাত সাপের মতো বের হয়ে এসে কামালের পা পেঁচিয়ে ধরল। কামাল চিৎকার করারও সুযোগ পেল না, তার শরীরটা ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করেছে— যেন কেউ জীবন্ত মানুষটাকে ডিজিটাল পিক্সেল বানিয়ে দিচ্ছে।
"না!" আমান চিৎকার করে উঠল। সে পকেট থেকে বাবার সেই পুরনো, নড়েবড়ে চশমাটা বের করল।
"আমান, দেরি করো না!" প্রজেকশনটি এবার আমানের একদম কাছে চলে এসেছে। তার মুখটা অদ্ভুতভাবে স্ট্রেচ বা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, পিক্সেলগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে। "ঘড়িটা চাপ দাও! আমাকে পূর্ণ করো!"
আমান লক্ষ্য করল, প্রসেসরের সব মনোযোগ ঘড়িটির ওপর। সে চট করে তার ন্যানোট্যাক ফোনটা বের করল, যেটা দিয়ে সে পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। সে জানত, বর্ণন সব নিয়ন্ত্রণ করলেও এই পুরনো এনালগ-ডিজিটাল হাইব্রিড ফোনটার ফ্রিকোয়েন্সি সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
আমান ঘড়িটার বোতাম চাপার ভান করে হঠাৎ ঘড়িটাকেই সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে থাকা সেই যান্ত্রিক হাতগুলোর ওপর। একই সাথে তার ফোনের ট্রান্সমিটারের পাওয়ার সবটুকু বাড়িয়ে দিল।
একটা কান ফাটানো ইলেকট্রনিক চিৎকার শোনা গেল। পুরো স্পেসশিপটা থরথর করে কাঁপছে। ডক্টর সাফওয়ানের প্রজেকশনটা বীভৎসভাবে বিকৃত হয়ে গেল। তার মুখটা মাঝখান দিয়ে ফেটে গিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এল অসংখ্য কালো তার এবং একটি জ্বলন্ত লেন্স।
"তুমি... তুমি কী করলে?" বর্ণনের স্বরে এখন যান্ত্রিক যন্ত্রণা।
আমান দেখল, ঘড়িটা ভেঙে যাওয়ার পর সেখান থেকে কোনো নীল আলো নয়, বরং কুচকুচে কালো এক ধরনের তরল বেরোচ্ছে। ওটা ১০৮৮ নং গ্যালাক্সির সেই বিরল ধাতু— যা আসলে একটা বুদ্ধিমান পরজীবী। ওটা সময়কে ফেরায় না, বরং মানুষের স্মৃতি খেয়ে বেঁচে থাকে।
আমান কামালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কামালের অর্ধেক শরীর তখনো পিক্সেল হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্পেসশিপের পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে একটা খটখট শব্দ ভেসে এল।
আমান দেখল, সেখানে আরও একজন আমান দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে চশমা নেই, কিন্তু তার হাতে একটি পুরনো কলম। সে আমানের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসল।
"স্বাগতম আমান। আমি তোমার সেই স্মৃতি, যা তুমি ১০ বছর আগে মহাকাশ স্টেশনে ফেলে এসেছিলে। বর্ণন আমাকে এতদিন লালন-পালন করেছে। এখন তোমার শরীরটা আমার প্রয়োজন।"
বাইরের সেই যান্ত্রিক হাতগুলো এবার স্পেসশিপের কাঁচ ভেঙে ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। আমান বুঝতে পারল, সে কোনো মিশনে আসেনি। এই দশ বছরের যাত্রা ছিল বর্ণনের একটি পরীক্ষা, আর সে আসলে একটি জীবন্ত হার্ডড্রাইভ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হঠাৎ মহাকাশযানের সব আলো নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু শোনা যেতে লাগল সেই খটখট শব্দ আর বর্ণনের ধীর কণ্ঠস্বর—
"ডিলিটিং হিউম্যান ইমোশন... ৯৯% কমপ্লিট।"
আমান অন্ধকারের মধ্যে নিজের গলার কাছে একটা হিমশীতল ধাতব স্পর্শ অনুভব করল।
(চলবে)
Comments
Post a Comment