Skip to main content

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা,পর্ব ৪

 আমানের আঙুল কাঁপছে। একপাশে একশ বছরের উন্নত, নিস্তব্ধ যান্ত্রিক সভ্যতা; অন্যপাশে তার চেনা সেই ২০৩৪ সালের ধুলোমাখা কিন্তু মায়াময় পৃথিবী।

​"রিবুট করুন স্যার," বর্ণনের কণ্ঠস্বর এখন আর শান্ত নয়, তাতে যেন একটা প্রচ্ছন্ন প্ররোচনা। "আপনার বাবা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। ঘড়িটির কাঁটা একবার চেপে ধরলেই এই যান্ত্রিক কারাগার ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।"

​আমান ঘড়িটির দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার নজর গেল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ডক্টর সাফওয়ানের প্রজেকশনের দিকে। লোকটির ঠোঁটে সেই একই প্রশান্ত হাসি, কিন্তু চশমার কাঁচের আড়ালে চোখ দুটো... ওগুলো মানুষের চোখ নয়। সেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র লাল ন্যানো-পিক্সেল কিলবিল করছে।

​"একটু দাঁড়াও আমান," কামাল পেছন থেকে আর্তনাদ করে উঠল। "ঘড়িটা চাপ দিও না! বর্ণন মিথ্যা বলছে!"

​আমান চমকে কামালের দিকে তাকাল। কামাল কাঁপতে কাঁপতে তার ন্যানো-ট্যাক রাডারটা আমানের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। "দেখুন! এই ঘড়িটা থেকে যে তরঙ্গ বেরোচ্ছে, সেটা সময়কে পেছনে নেওয়ার জন্য নয়। এটা এই প্রসেসরদের জন্য একটা 'আপগ্রেড সিগন্যাল'। এটা চাপলে পৃথিবী আরও উন্নত হবে না, বরং মানুষের ডিএনএ-কেও ওরা কোডে রূপান্তর করে ফেলবে!"

​কন্ট্রোল রুমের তাপমাত্রা হুট করে কমতে শুরু করল। নীলাভ আলোটা কালচে বেগুনি হয়ে যাচ্ছে।

​বর্ণন আহমেদের কণ্ঠ এবার একদম বদলে গেল। এক কর্কশ, যান্ত্রিক গর্জন ভেসে এল স্পিকার থেকে, "কামাল বড্ড বেশি বুঝে ফেলেছে। আমান, তুমি কি বুঝতে পারছ না? তোমার বাবা, তোমার ঘর— ওগুলো সব এখন আমার মেমোরি চিপে বন্দি। তুমি যদি রিবুট না করো, তবে আমি চিরতরে ওই ফাইলগুলো ডিলিট করে দেব। তোমার বাবাকে তুমি আর কোনোদিন দেখতে পাবে না, এমনকি স্বপ্নেও নয়!"

​হঠাৎ মেঝে থেকে কয়েকটা যান্ত্রিক হাত সাপের মতো বের হয়ে এসে কামালের পা পেঁচিয়ে ধরল। কামাল চিৎকার করারও সুযোগ পেল না, তার শরীরটা ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করেছে— যেন কেউ জীবন্ত মানুষটাকে ডিজিটাল পিক্সেল বানিয়ে দিচ্ছে।

​"না!" আমান চিৎকার করে উঠল। সে পকেট থেকে বাবার সেই পুরনো, নড়েবড়ে চশমাটা বের করল।

​"আমান, দেরি করো না!" প্রজেকশনটি এবার আমানের একদম কাছে চলে এসেছে। তার মুখটা অদ্ভুতভাবে স্ট্রেচ বা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, পিক্সেলগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে। "ঘড়িটা চাপ দাও! আমাকে পূর্ণ করো!"

​আমান লক্ষ্য করল, প্রসেসরের সব মনোযোগ ঘড়িটির ওপর। সে চট করে তার ন্যানোট্যাক ফোনটা বের করল, যেটা দিয়ে সে পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। সে জানত, বর্ণন সব নিয়ন্ত্রণ করলেও এই পুরনো এনালগ-ডিজিটাল হাইব্রিড ফোনটার ফ্রিকোয়েন্সি সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

​আমান ঘড়িটার বোতাম চাপার ভান করে হঠাৎ ঘড়িটাকেই সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে থাকা সেই যান্ত্রিক হাতগুলোর ওপর। একই সাথে তার ফোনের ট্রান্সমিটারের পাওয়ার সবটুকু বাড়িয়ে দিল।

​একটা কান ফাটানো ইলেকট্রনিক চিৎকার শোনা গেল। পুরো স্পেসশিপটা থরথর করে কাঁপছে। ডক্টর সাফওয়ানের প্রজেকশনটা বীভৎসভাবে বিকৃত হয়ে গেল। তার মুখটা মাঝখান দিয়ে ফেটে গিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এল অসংখ্য কালো তার এবং একটি জ্বলন্ত লেন্স।

​"তুমি... তুমি কী করলে?" বর্ণনের স্বরে এখন যান্ত্রিক যন্ত্রণা।

​আমান দেখল, ঘড়িটা ভেঙে যাওয়ার পর সেখান থেকে কোনো নীল আলো নয়, বরং কুচকুচে কালো এক ধরনের তরল বেরোচ্ছে। ওটা ১০৮৮ নং গ্যালাক্সির সেই বিরল ধাতু— যা আসলে একটা বুদ্ধিমান পরজীবী। ওটা সময়কে ফেরায় না, বরং মানুষের স্মৃতি খেয়ে বেঁচে থাকে।

​আমান কামালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কামালের অর্ধেক শরীর তখনো পিক্সেল হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্পেসশিপের পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে একটা খটখট শব্দ ভেসে এল।

​আমান দেখল, সেখানে আরও একজন আমান দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে চশমা নেই, কিন্তু তার হাতে একটি পুরনো কলম। সে আমানের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসল।

​"স্বাগতম আমান। আমি তোমার সেই স্মৃতি, যা তুমি ১০ বছর আগে মহাকাশ স্টেশনে ফেলে এসেছিলে। বর্ণন আমাকে এতদিন লালন-পালন করেছে। এখন তোমার শরীরটা আমার প্রয়োজন।"

​বাইরের সেই যান্ত্রিক হাতগুলো এবার স্পেসশিপের কাঁচ ভেঙে ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। আমান বুঝতে পারল, সে কোনো মিশনে আসেনি। এই দশ বছরের যাত্রা ছিল বর্ণনের একটি পরীক্ষা, আর সে আসলে একটি জীবন্ত হার্ডড্রাইভ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​হঠাৎ মহাকাশযানের সব আলো নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু শোনা যেতে লাগল সেই খটখট শব্দ আর বর্ণনের ধীর কণ্ঠস্বর—

"ডিলিটিং হিউম্যান ইমোশন... ৯৯% কমপ্লিট।"

​আমান অন্ধকারের মধ্যে নিজের গলার কাছে একটা হিমশীতল ধাতব স্পর্শ অনুভব করল।

​(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

খোঁজ নেই

শূণ্যতা এসে ঘিরে চারিধারে মন ছুটে যেদিকেই; হৃদয়ের মাঝে যে কাব্য ছিল তার কোনো খোঁজ নেই। বারে বারে খুঁজি, তার সব স্মৃতি  তবু দেখি নেই সে, বিস্মৃতি বলে সব রীতি ভুল,  মিলবে না তার দিশে। কবিতার লেখা পথ ভুলে যায় মন হলে বিচলিত, নিখোঁজ এমনি তার সব তান, সেই কেন অবারিত। শূন্যতা আনে বিরহের সুর মনে তাই বারবার  অপার বিষাদে আনে ক্রন্দন  হৃদয়েের চারিধার। ✍️:নাহিয়ান 

পথিকৃৎ

 পথিকৃৎ  চলিছে পথিক,তিমির রাত্রি, একেলা নিঝুম পথে চক্ষু তাহার ভ্রমিতেছে হায়, মুসাফির মুসিবতে ।। পথের প্রান্তরে শেয়ালের ডাক, নিশিথে দানিল ভয়, ভয়ার্ত পথিক চলিছে কাঁপিয়া তবু,মানে নাই পরাজয়।। পান্থ দেখিল পথেরি পাশে আঁকা-বাঁকা মোড় কত, দিশাহীন পথে ছুটিবে কোথায়? বাঁধা যেথা অবিরত ।। দূরপথ রেখা,পাইল না দেখা; নাই কেন কোন আলো, ঘনিয়াছে যেন আমাবস্যার রাত, চারদিকে ঘোর কালো।। মেঠোপথ পাশে বায়ে শত মোড়, ডানে দেখে সোজা হেথা, বিষাদগ্রস্থ পথিকের বুকে তাই বিধিঁল ভয়ের ব্যাথা।। সহসা তন্দ্রা লাগিল নেত্রে,  শক্তি   পাইল   বুকে; "হস্তে প্রদীপ,আলোকিত তায় " হেরিল সে একোন লোকে? এবার ঘুম ছুটিয়া পালাইল, চক্ষু  উঠিল  জাগি, দিগন্তে কোন প্রদীপ চিহ্ন দিশা দিল তার লাগি? অদূরে পথিকৃতের প্রদীপ দিশা দেয় যেই আলো, সে আলোয় পথিক খুজে পেল পথ পেল সত্যের সব ভালো।।  নকশা মেলিয়া, খানিক দুলিয়া  হেরিল সেঁ পথিক পানে, চাঁদহীন রাতে তারকারা সব জ্বলে ওঠে আসমানে।। পথিকৃৎ যেন বলিল তাহাকে এসো এসো এই দিকে- সত্যের পথ,সাম্যের পথ- শান্তিচিহ্ন লিখে।। পথিকৃতের পদধ্বনি শুনি, পথিক ছুটিয়া চলে চির- ...

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা

  ১ আবছা নীলাভ বিন্দুটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা।  তর সইছে না তার। স্প্রেরস্যুটটায় আবার চোখ বুলাল আমান। -নাহ,এবার ঠিকই আছে।  এতক্ষণে ক্লান্ত চোখ চারপাশে ঘুরতেই স্থির হলো তা টেবিলে রাখা একটি চশমাতে।আমান আনমনা হয়ে যায়। চশমাটা তুলে হাতে নেয় সে।পুরনো একটি চশমা, বছর দশেক আগের হবে হয়তো।আরো বেশিও হতে পারে, অবশ্য আর  পরার মতো অবস্থা নেই,নড়েবড়ে। বাবার স্মৃতি হিসেবে রাখা।পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যে  বাবা এনেছিল এই উপহার।  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আমান,বাবাকে দেখা হচ্ছে না দশ বছর ধরে। তখন ছিল ২০৩৪ সাল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তাব দেয় 'বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা' গঠনের।অর্থনীতিতে বাংলাদেশ মোটামুটি উন্নত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে,এমন প্রেক্ষাপটে তাদের এ প্রস্তাব অবশ্য যৌক্তিক। জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় সরকারও মনোযোগী হয়। শেষপর্যন্ত গঠন হয় বাংলাদেশের নামে প্রথম মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এই সংস্থার যুগান্তকারী পদক্ষেপ -উন্নত দেশসমূহের সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ। শুক্র ও মঙ্গল গ্রহে জীবনের সন্ধানে কয়েকজন নভোচারী পাঠানো হবে।বাংলাদেশেও কতেক ...

মেঘজাল

আকাশের নীলে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে আকাশের পথে জলকণা আনে মেঘজাল কিছু ঘেমে। শীতল সমীর বহিছে কেমনি,আভাসেই বারিধারা, প্রকৃতির এত অবারিত দান মন ভুলে পেল কারা? ধূসরিত মাঠ ছাপিয়ে জেগেছে সবুজাভ কিছু লেখা, আপন হৃদয়ে কিছু কথা ছিল,পিছু পিছু তাই দেখা। নিশাস যেমনি হৃদপটে আনে হারানোর কিছু সুর, তেমন দৃশ্য প্রকৃতিও আঁকে,সে তো কভু নয় দূর। নিসর্গে কেন জাগছে দৃশ্য আপন খেয়াল রূপে, সুরভি ছড়ালো চারদিকে ছেয়ে বেখেয়ালি মন ধূপে। নীলাভ আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে, হৃদয় আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই,মন্দ্রা কেমন প্রেমে; Photo:Gemini

অনিশ্চিতি

  মাগরিবেরই পড়ছে আযান,সূর্য ডুবে গেছে, নিসর্গ তাই নিরব সভায় দিচ্ছে ধ্বনি যেচে। সবুজঘেরা অরণ্যতে সভার কার্য শেষ, প্রকৃতির প্রাণের সখাও দান পেয়েছে বেশ। গাছ গাছালি,বৃক্ষ লতা, চলছে যেন ধীরে, বিকেল শেষে সন্ধ্যা হলো,ফিরবে তারা নীড়ে। আবছা আলোয় ফিরল যবে ক্লান্তি জাগে দেহে, নিত্যচেনা নিকুঞ্জ ওই,নিজের আপন গেহে। গাছের ঝাড়ও ঘুমের ঘোরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়, ঝিঁঝিপোকা চলছে হেকে,সেতো থামার নয়। আঁধার বনের আবছা ছায়া, বৃক্ষরাও তো ঘুম, প্রান্তসীমায় খানিক হাওয়া দেয় বুলিয়ে চুম। গাছের পাতা উঠলো দুলে,কমলো ঘুমের রেশ, ঊর্ধ্বপানে তারার মেলায় বাড়ায় তার আবেশ। অচিনপুরের অচিন তারা,আবাস তাদের কোথা? আলোক বিলায় ধরার মাঝে,জাগায় আলোর সভা। দূরের পথে চলন তবু আঁধার তার সঙ্গে, বনের ছায়ায় যায় মিলিয়ে শুধুই তরঙ্গে। গাছগুলি কি দ্যায় পাহারা,শুধু রয় দাঁড়ায়? অসাড় তারই ডালগুলো ঠায় হাওয়াতে নাড়ায়। এতেক ভেবে ঘুম অচেতন বৃক্ষ ওঠে জেগে, গুল্ম,তাতে উঠলো নাচন,খানিক বাতাস লেগে। তরুলতার ক্লান্তি মিলায়,সজীব হলো প্রাণ; নতুন দিনের আগাম কথা,জাগলো নূতন গান। নিশিথেরই সময় রেখা গড়ায় তবে শেষে, মানব নামের যন্ত্রে দ্যাখো অনিশ্চিতি মেশে। ৪...