Skip to main content

নীলাভ গ্রহের বাসিন্দা

 


আবছা নীলাভ বিন্দুটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। 

তর সইছে না তার।


স্প্রেরস্যুটটায় আবার চোখ বুলাল আমান।

-নাহ,এবার ঠিকই আছে। 

এতক্ষণে ক্লান্ত চোখ চারপাশে ঘুরতেই স্থির হলো তা টেবিলে রাখা একটি চশমাতে।আমান আনমনা হয়ে যায়।


চশমাটা তুলে হাতে নেয় সে।পুরনো একটি চশমা, বছর দশেক আগের হবে হয়তো।আরো বেশিও হতে পারে, অবশ্য আর  পরার মতো অবস্থা নেই,নড়েবড়ে। বাবার স্মৃতি হিসেবে রাখা।পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যে  বাবা এনেছিল এই উপহার। 


একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আমান,বাবাকে দেখা হচ্ছে না দশ বছর ধরে। তখন ছিল ২০৩৪ সাল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তাব দেয় 'বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা' গঠনের।অর্থনীতিতে বাংলাদেশ মোটামুটি উন্নত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে,এমন প্রেক্ষাপটে তাদের এ প্রস্তাব অবশ্য যৌক্তিক। জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় সরকারও মনোযোগী হয়। শেষপর্যন্ত গঠন হয় বাংলাদেশের নামে প্রথম মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এই সংস্থার যুগান্তকারী পদক্ষেপ -উন্নত দেশসমূহের সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ। শুক্র ও মঙ্গল গ্রহে জীবনের সন্ধানে কয়েকজন নভোচারী পাঠানো হবে।বাংলাদেশেও কতেক মেধাবী তরুণদের খোঁজা হচ্ছে যারা এ মিশনে অংশগ্রহণ করবে।


পাশের কামরা থেকে এক ধরনের যান্ত্রিক শব্দ আসছে। একজন নভোচারী  সেখানে রয়েছে। নাম কামাল।একজন দায়িত্বশীল ও দক্ষ নভোচারী।।আমানের পরেই স্পেসশিপের সার্বিক দায়িত্ব কামালের।তার রুম হতে খটখট শব্দ আসছে।প্রাচীন কম্পিউটার থেকে শুরু করে বর্তমানের ন্যানোট্যাক যন্ত্রের খুটিনাটি সবই তার জানা ।


—এই লোকটা সারাদিন  শুধু ঠুকঠাক করেই যাচ্ছে।

আমান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।


আমানের বয়স তখন বিশ-বাইশ হবে হয়ত। খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের  একজন বিজ্ঞানে পড়ু্য়া।অ্যাডভেঞ্চারের নেশা চেপে বসে ছোটকাল থেকেই।মহাকাশ গবেষণা সংস্থা'র এমন উদ্যোগ তার রোমাঞ্চকর ঠেকে।তাছাড়াও,পরিবারের অর্থনীতিও টানাপোড়েনের মধ্যে।এমন পরিস্থিতিতে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই আমান আবেদন করে বসল।কিন্তু তার জন্য যে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে সেটা কে জানতো?


-স্যার আপনার দীর্ঘ দশ বছরের মহাকাশ ভ্রমণ শেষ হতে চলেছে।আপনি এখন পৃথিবীতে যাওয়া জন্য প্রস্তুত।

যান্ত্রব স্বরে একটানা কথাগুলো বলে গেল প্রসেসর।

—আচ্ছা, তবে তাই হোক।আমান জবাব দিল।


-ও হ্যা। আমরা নতুন অভিযান থেকে ফিরেছি  কতদিন হলো?আমানের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি প্রসেসরের পর্দার দিকে।


প্রসেসর বলল,গত অভিযানে আমরা বিশ্ব ভ্রম্যান্ডের1088 নং গ্যালাক্সি ভ্রমণ করেছিলাম যেখানে বৃহদাকার দানব আমাদের আক্রমণ করেছিল।ঘটনাটা এই  মহাকাশ ক্ষন অনুযায়ী সপ্তাহ বিশেক আগের হলেও মহাকাশ যানের পরিমাপক সময়ে তা মাত্র চারদিন।


—চারদিন!কিভাবে সম্ভব?সময় তো এভাবে ভিন্নতা প্রদর্শন করে না।আমানের কন্ঠে উদ্বেগ।—শোনো,বর্ণন।মহাকাশযান তোমার সার্বিক নিয়ন্ত্রণে  চলছে,তারপও তুমি এমন অসামঞ্জস্য তথ্য দিচ্ছ?জানো না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্নদের এমন আচরণ মহাজাগতিক আইনে চরম অপরাধ?


প্রসেসর ভাবছে,কিছুই বলছে না।হয়তো আমানের অবস্থা বুঝতে চাইছে।প্রসেসরের মূল নাম বর্ণন। বর্ণন আহমেদ। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠাকালীন বিজ্ঞানীর নামে। এই মহাকাশযান বর্ণনের নিয়ন্ত্রণে চালিত হয়ে আসছে।


 বর্ণন মৃদুস্বরে শব্দ করে।আমান হকচকিয়ে ওঠে।—তাহলে তো স্বীকার করলি যে এমন অপরাধ তুই করতে পারিস,না?


—স্যার,শুনুন।গত গ্যালাক্সি1088 এ ভ্রমনের সময়ের কথা তো নিশ্চয়ই মনে আছে।এই স্পেরশিপটা তখন একটি মাঝারি আকারের কৃষ্ণ গহ্বরের কাছাকাছি স্থানে ছিল,প্রায় দশ লক্ষ পনেরো হাজার কিলোমিটারের দূরত্বে।


—হাহা,এত কাছাকাছি জায়গায় তো ব্লেক হোলের মধ্যেই স্পেরশিপটা হারিয়ে যাবার কথা। ওহহো,গ্যালাক্সি1088 তে ল্যান্ড করার দিকে নজর দেওয়ায় ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলাম।


বর্ণনের বর্ননায় ঈষৎ বিরক্তি।—স্যার,ওই ব্লেক হোলের একপাশে একটা বৃহৎ গ্রহ ছিল,এ দুইয়ের মাঝে আকর্ষণে আমাদের স্পেরশিপের ল্যান্ডিয়ের  জন্য ওই জায়গাটা স্থিতিশীল ছিল।


এত ক্ষণ আমান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। —আচ্ছা,বুঝালাম।এই ব্লেক হোল তাহলে সময়কেও গ্রাস করে?আমানের মুখে ঈষৎ তাচ্ছিল্য। 


হ্যা সূচক শব্দ করে প্রসেসর।দীর্ঘ বিরতি নিয়ে বলে,স্যার। আপনি আপনার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন।নব পৃথিবীর সীমানায় আপনাকে স্বাগতম। 


আমান হাসে।প্রসেসরকে এই বাংলা ভাষা শেখাতে কতই না কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। 


—স্যার।

প্রসেসর আবার জিজ্ঞেস করে,গ্যালাক্সি 1088 থেকে উপহারের জন্য যে বিরল 

ধাতু এনেছিলেন তা নিলেন না যে?


ও হ্যা।যেন মনে পড়েছে এমন ভাব আমানের।

কাছের রোবটটি এনে দেয় বিশেষ তন্তুতে মোড়ানো একটা বক্স।


বাবার জন্য আমান এখানে উপহার নিয়েছে। একটি ঘড়ি।মহাজগতের সবচেয়ে দামি ধাতু দিয়ে তৈরি। 


পৃথিবী হতে  একশ' কিলোমিটারের মধ্যে ওদের স্পেরশিপ।পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের জন্য ট্রান্সমিটার বের করে আমান।একটি ছোট আকারের ফোন।বর্তমানে সকল প্রযুক্তিই ন্যানোট্যাকনোলজি।গতবারের গ্যালাক্সি 1088 তে অভিযানে তারা যখন বীভৎস দানবদের কাছে পরাজিত হয়েই যাচ্ছিল,তখন প্রসেসরের বুদ্ধিতে ন্যানোট্যাক অস্ত্র দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।


হঠাৎ ট্রান্সমিটারে অ্যলার্মের সাথে লাল বাতি জ্বলে ওঠে। সংকেতটা এসেছে পৃথিবী থেকে এবং খবু কম সময়ের। তবে কি কোন দুঃসংবাদ?

(চলবে)

লেখা:কাজী আহমদ এয়ার খান নাহিয়ান

Comments

Popular posts from this blog

খোঁজ নেই

শূণ্যতা এসে ঘিরে চারিধারে মন ছুটে যেদিকেই; হৃদয়ের মাঝে যে কাব্য ছিল তার কোনো খোঁজ নেই। বারে বারে খুঁজি, তার সব স্মৃতি  তবু দেখি নেই সে, বিস্মৃতি বলে সব রীতি ভুল,  মিলবে না তার দিশে। কবিতার লেখা পথ ভুলে যায় মন হলে বিচলিত, নিখোঁজ এমনি তার সব তান, সেই কেন অবারিত। শূন্যতা আনে বিরহের সুর মনে তাই বারবার  অপার বিষাদে আনে ক্রন্দন  হৃদয়েের চারিধার। ✍️:নাহিয়ান 

পথিকৃৎ

 পথিকৃৎ  চলিছে পথিক,তিমির রাত্রি, একেলা নিঝুম পথে চক্ষু তাহার ভ্রমিতেছে হায়, মুসাফির মুসিবতে ।। পথের প্রান্তরে শেয়ালের ডাক, নিশিথে দানিল ভয়, ভয়ার্ত পথিক চলিছে কাঁপিয়া তবু,মানে নাই পরাজয়।। পান্থ দেখিল পথেরি পাশে আঁকা-বাঁকা মোড় কত, দিশাহীন পথে ছুটিবে কোথায়? বাঁধা যেথা অবিরত ।। দূরপথ রেখা,পাইল না দেখা; নাই কেন কোন আলো, ঘনিয়াছে যেন আমাবস্যার রাত, চারদিকে ঘোর কালো।। মেঠোপথ পাশে বায়ে শত মোড়, ডানে দেখে সোজা হেথা, বিষাদগ্রস্থ পথিকের বুকে তাই বিধিঁল ভয়ের ব্যাথা।। সহসা তন্দ্রা লাগিল নেত্রে,  শক্তি   পাইল   বুকে; "হস্তে প্রদীপ,আলোকিত তায় " হেরিল সে একোন লোকে? এবার ঘুম ছুটিয়া পালাইল, চক্ষু  উঠিল  জাগি, দিগন্তে কোন প্রদীপ চিহ্ন দিশা দিল তার লাগি? অদূরে পথিকৃতের প্রদীপ দিশা দেয় যেই আলো, সে আলোয় পথিক খুজে পেল পথ পেল সত্যের সব ভালো।।  নকশা মেলিয়া, খানিক দুলিয়া  হেরিল সেঁ পথিক পানে, চাঁদহীন রাতে তারকারা সব জ্বলে ওঠে আসমানে।। পথিকৃৎ যেন বলিল তাহাকে এসো এসো এই দিকে- সত্যের পথ,সাম্যের পথ- শান্তিচিহ্ন লিখে।। পথিকৃতের পদধ্বনি শুনি, পথিক ছুটিয়া চলে চির- ...

মেঘজাল

আকাশের নীলে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে আকাশের পথে জলকণা আনে মেঘজাল কিছু ঘেমে। শীতল সমীর বহিছে কেমনি,আভাসেই বারিধারা, প্রকৃতির এত অবারিত দান মন ভুলে পেল কারা? ধূসরিত মাঠ ছাপিয়ে জেগেছে সবুজাভ কিছু লেখা, আপন হৃদয়ে কিছু কথা ছিল,পিছু পিছু তাই দেখা। নিশাস যেমনি হৃদপটে আনে হারানোর কিছু সুর, তেমন দৃশ্য প্রকৃতিও আঁকে,সে তো কভু নয় দূর। নিসর্গে কেন জাগছে দৃশ্য আপন খেয়াল রূপে, সুরভি ছড়ালো চারদিকে ছেয়ে বেখেয়ালি মন ধূপে। নীলাভ আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই তন্দ্রা কেমন নেমে, হৃদয় আকাশে মেঘ নিল ঠাঁই,মন্দ্রা কেমন প্রেমে; Photo:Gemini

অনিশ্চিতি

  মাগরিবেরই পড়ছে আযান,সূর্য ডুবে গেছে, নিসর্গ তাই নিরব সভায় দিচ্ছে ধ্বনি যেচে। সবুজঘেরা অরণ্যতে সভার কার্য শেষ, প্রকৃতির প্রাণের সখাও দান পেয়েছে বেশ। গাছ গাছালি,বৃক্ষ লতা, চলছে যেন ধীরে, বিকেল শেষে সন্ধ্যা হলো,ফিরবে তারা নীড়ে। আবছা আলোয় ফিরল যবে ক্লান্তি জাগে দেহে, নিত্যচেনা নিকুঞ্জ ওই,নিজের আপন গেহে। গাছের ঝাড়ও ঘুমের ঘোরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়, ঝিঁঝিপোকা চলছে হেকে,সেতো থামার নয়। আঁধার বনের আবছা ছায়া, বৃক্ষরাও তো ঘুম, প্রান্তসীমায় খানিক হাওয়া দেয় বুলিয়ে চুম। গাছের পাতা উঠলো দুলে,কমলো ঘুমের রেশ, ঊর্ধ্বপানে তারার মেলায় বাড়ায় তার আবেশ। অচিনপুরের অচিন তারা,আবাস তাদের কোথা? আলোক বিলায় ধরার মাঝে,জাগায় আলোর সভা। দূরের পথে চলন তবু আঁধার তার সঙ্গে, বনের ছায়ায় যায় মিলিয়ে শুধুই তরঙ্গে। গাছগুলি কি দ্যায় পাহারা,শুধু রয় দাঁড়ায়? অসাড় তারই ডালগুলো ঠায় হাওয়াতে নাড়ায়। এতেক ভেবে ঘুম অচেতন বৃক্ষ ওঠে জেগে, গুল্ম,তাতে উঠলো নাচন,খানিক বাতাস লেগে। তরুলতার ক্লান্তি মিলায়,সজীব হলো প্রাণ; নতুন দিনের আগাম কথা,জাগলো নূতন গান। নিশিথেরই সময় রেখা গড়ায় তবে শেষে, মানব নামের যন্ত্রে দ্যাখো অনিশ্চিতি মেশে। ৪...