সরফরাজের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল টলটল করে গড়িয়ে পড়ল। সেটা যন্ত্রণার চেয়েও বেশি ছিল বিশ্বাসের অপমৃত্যুর। তিনি বিড়বিড় করে বলতে চাইলেন— "চন্দ্রিমা... তুমিও?" কিন্তু কণ্ঠস্বর আটকে গেল জমাটবদ্ধ রক্তে।
চন্দ্রিমা ঘোড়া থেকে নেমে ধীর পায়ে সরফরাজের রক্তাক্ত দেহের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তার পরনে এখনো সেই আধপোড়া রাজকীয় পোশাক, কিন্তু চোখে কোনো দয়া নেই। তিনি বলতে শুরু করলেন, "পিতা জানতেন, সম্মুখ সমরে অলেখ্যগড়কে হারানো অসম্ভব। তাই তিনি আমাকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তোমার সাম্রাজ্য বিস্তারের যে বুদ্ধি আমি তোমাকে দিতাম, সেগুলো ছিল আসলে আমার পিতার পাতা এক একটি ফাঁদ। তোমার অজেয় দুর্গ আজ ভেতর থেকেই ফেটে পড়েছে, সরফরাজ।"
ঠিক সেই মুহূর্তে দুর্গের বাইরে থেকে আকাশ ফাটানো চিৎকার শোনা গেল। অলেখ্যগড়ের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ছে অমরনগরের বিশাল বাহিনী। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিরা ততক্ষণে অস্ত্র নামিয়ে ফেলেছে।
সরফরাজ অস্ফুট স্বরে বললেন, "আমি... আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম... আমার সাম্রাজ্যের চেয়েও বেশি..."
চন্দ্রিমার হাতের ধনুকটা কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার পাথুরে চোখে মেঘ জমল। তিনি জানতেন, এই চৌদ্দ বছর বয়সী অদম্য রাজা আসলে হৃদয়ের দিক থেকে ছিলেন ভীষণ একা। সরফরাজ তাকে কেবল রানি নয়, তার আত্মার অংশ করে নিয়েছিলেন। চন্দ্রিমার মনে পড়ে গেল সেই সব নিভৃত রাতের কথা, যখন সরফরাজ তাকে বলতেন— "চন্দ্রিমা, এই মুকুট বড় ভারী, কেবল তোমার কাছে এলেই আমি শান্তির নিঃশ্বাস পাই।"
কিন্তু রাজধর্ম বড় নিষ্ঠুর। চন্দ্রিমা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "ভালোবাসা ছিল আমার অভিনয়, আর প্রতিশোধ আমার রক্তে। তুমি আমার দাদাকে হত্যা করেছিলে, মনে পড়ে? সেই রক্তঋণ আজ শোধ হলো।"
বাইরে তখন অলেখ্যগড় পুড়ছে। আগুনের লেলিহান শিখা দরবার কক্ষের জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। ঠিক তখনই এক বার্তাবাহক ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। তার সারা শরীর রক্তাক্ত। সে অমরনগরের রাজার অর্থাৎ চন্দ্রিমার পিতার সেনাপতি।
সে চিৎকার করে বলল, "রাজকুমারী! পালান! ধোঁকা! অমরনগরের রাজা আপনাকেও বলি দিয়েছেন!"
চন্দ্রিমা চমকে উঠলেন, "মানে?"
"মহারাজ অমরনগরের সিংহাসনে তার পুত্রকে বসাতে চান। আপনি অলেখ্যগড়ের রানী হিসেবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার পথের কাঁটা হতেন। তাই তিনি আদেশ দিয়েছেন— অলেখ্যগড়ের অন্দরমহলের সাথে এই দরবারও যেন ভস্মীভূত করা হয়। কাউকেই জীবিত রাখা হবে না, এমনকি আপনাকেও নয়!"
কথা শেষ হতে না হতেই ওপর থেকে বিশাল একটি জ্বলন্ত ঝাড়লণ্ঠন চন্দ্রিমার খুব কাছে ভেঙে পড়ল। চন্দ্রিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যে পিতার জন্য তিনি নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিলেন, সেই পিতাই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
সরফরাজ তখনো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেননি। তিনি কষ্টে হাত বাড়িয়ে চন্দ্রিমার পায়ের নূপুর স্পর্শ করলেন। তার ঠোঁটে এক ম্লান হাসি। তিনি জানতেন আজ রাতেই সব শেষ হয়ে যাবে।
"চন্দ্রিমা..." সরফরাজ অতি কষ্টে বললেন, "আমার খঞ্জরটা...আমার কোমরে... ওটা দিয়ে আমাকে মুক্ত করো। শত্রুর দেওয়া আগুনের চেয়ে... আপনজনের দেওয়া মৃত্যু অনেক বেশি সম্মানের।"
চন্দ্রিমা সরফরাজের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। বাইরে থেকে তার নিজের পিতার সৈন্যরা দরবার কক্ষের দরজা আটকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর হাহাকার। চন্দ্রিমা বুঝতে পারলেন, তিনি না পেলেন বাবার রাজ্য, না রাখলেন প্রেমিকের বিশ্বাস। তিনি এখন এক নিঃস্ব রাজকুমারী, যার চারপাশ ঘিরে কেবল ধ্বংসস্তূপ।
চন্দ্রিমা সরফরাজের মাথাটি নিজের কোলে তুলে নিলেন। সরফরাজের নিথর হাতটি তখনো চন্দ্রিমার রক্তমাখা হাতটি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। চন্দ্রিমা নিজের চোখের জল আর সামলাতে পারলেন না। তিনি এবার সরফরাজকে কিছু বললেন যেখানে অভিনয় ছিল না, ছিল গভীর অনুশোচনা।
"পরজন্মে আমি শুধু চন্দ্রিমা হয়ে আসব সরফরাজ, কোনো রাজার কন্যা হয়ে নয়।"
অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান শিখা যখন সিংহাসন গ্রাস করতে এল, তখন চন্দ্রিমা সেই বিষাক্ত তীরটি নিজের বুকেও বিঁধিয়ে দিলেন। অলেখ্যগড়ের সূর্য চিরতরে অস্ত গেল। পরের দিন সকালে লোকে দেখল— ভস্মীভূত প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপের মাঝে পাশাপাশি শুয়ে আছে দুই শত্রু, যাদের মৃত্যু এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে এক মর্মান্তিক পরিণতি।

Comments
Post a Comment