মহারাজের চেহারায় কেমন যেন দুশ্চিন্তার ছাপ। নাম তার সরফরাজ। সরফরাজ অলেখ্যগড়ের রাজা। তার রাজত্বে সার্বভৌম অলেখ্য সাম্রাজ্য। চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, ষড়যন্ত্রের মধ্যেও তিনি প্রজ্ঞার বলে টিকিয়ে রেখেছেন তার অলেখ্য সাম্রাজ্য। কিন্তু আজকের মতো কঠিন পরিস্থিতি তার আগে কখনো হয়নি।
সরফরাজের হাতে চিঠি। রাগে ক্ষোভে ফুঁসছেন তিনি। দরবারের মন্ত্রীদের মনে নানা উৎকণ্ঠা। প্রধান কুতুব আর তর সইতে পারলেন না।
—অমরনগরের রাজাকে আজ শিক্ষা দিতে হবে, কঠিন শিক্ষা। অলেখ্যগড়ের সম্রাটের দূতকে সে হত্যা করেছে। আজ তাকে শিক্ষা দিতে হবে।
দ্বিতীয় অমাত্য আবার রাজার রাগ সংবরণ করার জন্য আসলেন এগিয়ে।
—মহারাজ, আপনি খুবই দয়ালু। আপনি এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অমরনগরে আক্রমণ করা মোটেও ঠিক হবে না। তার নগরের নিরীহ মানুষদের হত্যা করা কোনোভাবেই উচিত হবে না।
সম্রাট সরফরাজ এতক্ষণ পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লম্বা আলখাল্লায় সূক্ষ্ম সুতার কারুকার্য। রেশমী কাপড়ের হাতায় হাত বুলালেন তিনি। ধীর পদক্ষেপে আসলেন দ্বিতীয় অমাত্যের নিকট। আর তৎক্ষণাৎ ফিরে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুটল তার দিকে।
ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে পড়ল সরফরাজের চেহারায়। জানালার চৌকাঠ ভেঙে রোদ আসছে খুব। সেই রৌদ্রে সরফরাজের হাতে থাকা খঞ্জর চকচক করছে। ছোট্ট সেই খঞ্জর থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।
খঞ্জর কোষবদ্ধ হলো। সমগ্র দরবার থমথমে। প্রধানমন্ত্রী, কুতুব, সভাসদ, কোতোয়াল, প্রহরী সবাই ভয়ে কাঁপছে। তাদের দৃষ্টি যেন শুকনো তরুর মর্মর ধ্বনি, একটু বিক্ষিপ্ত হলেই যেন ভেঙে পড়বে।
সম্রাট এবার এসে দাঁড়ালেন সিংহাসনে। বোঝাই যাচ্ছে তার কপালের ভাঁজ দুশ্চিন্তার নয় বরং ক্ষোভের। হাত দিয়ে স্বর্ণমুকুট খুলে রাখলেন সিংহাসনের ত্রিকোণে। সরফরাজ হুংকার ছাড়লেন—
—আমার সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যে বিন্দুমাত্র আপস করবে তার পরিণতি হবে মৃত্যু।
সরফরাজের হাত এখনও মুষ্টিবদ্ধ। হাতে আর পোশাকে লেগে আছে রক্ত। সকল অলংকার ছাপিয়ে কেবল রক্তের চিহ্ন দেখে সবার ক্লান্তমুখর চোখ।
সন্তর্পণে বার্তাবাহক এসে সরফরাজের নিকট দাঁড়াল। তার ইশারায় বার্তাবাহক কিছু এগিয়ে আসে। কানে কানে বলল—
—মহারাজ, মহারানি আপনাকে ডেকেছিলেন। কোনো এক দুর্ঘটনায় অন্দরমহলে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। গোটা পঞ্চাশেক কামরা পুড়ে গিয়েছে অনেক আগেই। মহারানি কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছেন।
সরফরাজ কিছু বললেন না। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আবার দুর্ঘটনা। উৎকণ্ঠা আর চিন্তায় বসে রইলেন। বার্তাবাহককে ইশারা করলেন চলে যেতে।
রানিদের মধ্যে রাজার সবচেয়ে প্রিয় ছিল মহারানি। যদিও রাজার মহলে সবচেয়ে নতুন ছিলেন তিনি। তবুও কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি রাজার মন জয় করে ফেলেন। সরফরাজ কেবল তার সাথেই আলোচনা করেন, পরামর্শ নেন। তার পরামর্শেই সরফরাজ ছোট ছোট রাজ্য কব্জা করেছেন সুকৌশলে। স্বল্প সময়ে বিস্তৃত করেছেন অলেখ্য সাম্রাজ্য।
সরফরাজ কেবল ভাবছেন। দীর্ঘ প্রশ্বাসে বুক টানটান হয়। পরক্ষণেই নিঃশ্বাসের ধ্বনি অর্থবোধক শব্দ বানায় না, সেথায় আছে শুধু গম্ভীরতার প্রচ্ছদ।
দরবারের বিরাট জানালায় দেখা যায় ধুলা উড়িয়ে কারা যেন আসছে। কাছে আসতেই দেখা গেল এই অশ্বারোহী দল আসলে মহারানির। তাদের পরিচ্ছদ মলিন, কারো কারো পোশাকের অংশবিশেষ পুড়েও গিয়েছে। তবে কি এই অগ্নিকাণ্ড অমরনগরের রাজার কাজ?
দরবারের সেনাপতি রাজার কাছ থেকে অনুমতি চাইলেন যুদ্ধের। সরফরাজ সময় ব্যয় না করেই অনুমতি দিলেন। জঙ্গ বাহাদুর ইসমাইল শাহ হলেন সেনাপতি। ইসমাইল শাহ দরবার থেকে ওঠার আগেই প্রহরীরা দরজাটা খুলে দিল। বিপর্যস্ত অশ্বারোহী দল দুয়ারে দাঁড়িয়ে। আর তাদের সামনে স্বয়ং মহারানি।
উৎকণ্ঠিত সরফরাজ উঠে দাঁড়াল। আর তখনই সাঁই সাঁই করে ছুটে এলো তীর। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় প্রথম তীর মোকাবিলা করলেন। পরমুহূর্তে বুকের বাঁ পাশে এসে বিদ্ধ হলো দ্বিতীয় তীরটি।
প্রচণ্ড ব্যথায় মুষড়ে পড়লেন সরফরাজ, তার এমন যন্ত্রণা হতে লাগল যেন কেউ তার শরীর থেকে চামড়া আলাদা করে নিচ্ছে। ধরাশায়ী হয়ে সিংহাসনের নিচে উপুড় হয়ে পড়লেন। মৃত্যুর আগে শেষবার চোখ মেলতে চাইলেন প্রাণপণে। আর ক্লান্ত চোখের মণি সর্বশেষ দেখল এক অবিশ্বাসের দৃশ্য।
ধনুক হাতে স্বয়ং মহারানি। তীর এসেছে তার থেকেই। তার অশ্বারোহী দলের অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। দৃষ্টিতে এক দৃঢ়কল্প মনোবল।
ইসমাইল শাহর বাম হাতে তীর লেগেছে। আরেকটু হলেই হৃদপিণ্ড এফোঁড়-ওফোঁড়। পুরো দরবার হাঁটু গেড়ে রয়।
ঘোড়া নিয়েই এগোলেন মহারানি। মুমূর্ষু রাজা সরফরাজের সামনে দাঁড়ালেন। অচপল ভঙ্গিতে বললেন, "খুব কম সময়ে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই।" রাজার অবিশ্বাসী চোখ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রানি বললেন, "আমিই হলাম অমরনগরের রাজার একমাত্র কন্যা চন্দ্রিমা।"
~নাহিয়ান

Comments
Post a Comment